ফিচার সারাদেশে

আমার স্মৃতিতে পাবনায় বঙ্গবন্ধু——বীর মুক্তিযোদ্ধা আ.স.ম. আব্দুর রহিম পাকন

আবহমান বাংলার চিরকালের সৌন্দর্য, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাঙালিরই নয় সমগ্র পৃথিবীর অহংকার। আমার স্মৃতিতেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সমুজ্জ্বল হয়ে আছেন। এই স্মৃতি সদাই জাগ্রত। আমার জীবনে পাবনায় বঙ্গবন্ধুর বিচিত্র স্মৃতি চিত্রিত হয়ে আছে চিরকালের জন্যে। এটা শুধু আমার মনে ও মননে। ছবির ভাষায় কিংবা রঙে বা আলোকচিত্রে এর ব্যাখ্যা হয়ত সুস্পষ্ট নয়, তবুও এটা বিন্দুর বুকে সিন্ধুর ছায়াপাত। যা আমি আঁকড়ে ধরে আছি বছরের পর বছর। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে (১৯৭২-১৯৭৫) আমি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের পর্যায়ক্রমে ভারাপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক। তখন পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেশ কয়েকবার পাবনায় এসেছেন। পাবনায় তাঁর গুণগ্রাহী, দলীয় নেতাকর্মী এবং ভক্তবৃন্দের অভাব ছিল না।

১৯৬৬ সালের ৭ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে আমি প্রথম দেখি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন ছয় দফাকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে উল্কার মত ছুটে বেড়াচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় পাবনাতেও তিনি পদার্পণ করেন। পাবনায় এসেই তিনি তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রব বগা মিয়ার বাসায় দুপুরের খাওয়া শেষ করে টাউন হল ময়দানে ছয় দফা বিশ্লেষণ করে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। টাউন হল ময়দানের বিশাল জনসভায় আমি ছয় দফার বিষয় বুঝে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়লাম। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হবার অনুপ্রেরণা পাই। সেই আদর্শ এখানও লালন করে যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধুকে সেই প্রথম দেখার অনুভূতি এখনো ভুলতে পারি নাই।

১৯৬৭ এর গণআন্দোলন এবং ৬৮-৬৯ এর ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সামারিক পাকিস্তানী শাসকরা বঙ্গবন্ধুর নামে আগড়তলা মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে জাতীয় নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। যেটা ছিল বাঙ্গালীর জাতির জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ইতিহাসের বিশেষ ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। এই আন্দোলনে পাবনার আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ ও সর্বস্তরের জনগণ বিশষে ভূমিকা রাখে যার সঙ্গে আমিও প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম।

১৯৭০ সালে ৮ই মার্চের নির্বাচনী প্রচারণায় বঙ্গবন্ধু পাবনায় আসেন। সে সময়ে আমি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক ছিলাম। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারনায় তাঁর সাথী হিসেবে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমেদ সহ আরও কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে নিয়ে দাশুড়িয়া, টেবুনিয়া, এডওয়ার্ড কলেজ গেট হয়ে পাবনায় প্রবেশ করেন। সে সময়ে এডওয়ার্ড কলেজ গেটে আওয়ামী লীগ বিরোধীরা বাধা প্রদানের চেষ্টা করে সফল হতে পারেনি। এই বাধা অতিক্রম করে সার্কিট হাউজে দুপুরের খাবার বিরতি দেন। এখানে ফুলের মালা দিয়ে তাঁকে বরণ করি এবং পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার সুযোগ পাই। তিনি আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করেন এবং বলেন ‘আমার কোর্ট অপরিস্কার হয়েছে এটাকে পরিস্কার করা দরকার’। তখন আমি ও চুপ্পু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গায়ের কোটটি নিয়ে শহরের একমাত্র ‘রুচিরা ড্রাই ক্লিনার্স’ এ যাই যার মেশিন ছিল বিসিক শিল্প নগরীতে কিন্তু শুক্রবার হওয়াতে ড্রাই ক্লিনার্স দোকান বন্ধ ছিল। পরে বিসিক শিল্প নগরীতে যেয়ে কোর্টটা পরিস্কার করে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নিকট পৌঁছাই। তিনি আমাদের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন ‘তোদের দ্বারাই বাঙালি জাতি বৈষম্য থেকে মুক্ত হতে পারে’। বিরতির পর বেড়া কাশীনাথপুনে নির্বাচনী জনসভার উদ্দ্যেশে তাঁর সফর সঙ্গী হিসেবে জেলা আওয়ামীলীগের সঙ্গে আমরাও ছিলাম। এই জনসভায় এসে রূপপুরে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এবং আরিচা নগরবাড়ি সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেক হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়ন করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আমি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থায় কাজ করার সুবাদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বিভিন্নভাবে সহযোগীতা করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি। ১৯৭০ সালের ২২ ডিসেম্বর পাবনা বাসীর জন্য একটি শোকাবহ দিন। এই দিনে প্রাদেশিক পরিষদের সদ্য নির্বাচিত (সাঁথিয়া-বেড়া) সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য আহম্মেদ রফিক নকশালীদের হাতে নিহত হন। ১৯৭০ সালের ২৫ ডিসেম্বর এই শোকাবহ হৃদয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু পাবনায় এসে আহম্মেদ রফিকের পরিবারের সাথে দেখা করে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং আরিফপুর গোরস্তানে গিয়ে কবর জিয়ারত করে পুলিশ লাইন ময়দানে শোকসভায় অংশগ্রহণ করেন। সভামঞ্চে ছাত্রনেতাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। মঞ্চ থেকে নামার সময় বঙ্গবন্ধু আমাদের উদ্দ্যেশে বলেন, “তোরা প্রস্তুত থাকবি। সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করতে হবে।”

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর আহবানে আমি এবং আমার সহোদর দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করি। দীর্ঘ নয় মাস রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধশেষে ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নতুন একটি দেশ হিসেবে স্থান পায়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু স্বৈরাচারী সামরিক পাকিস্তানী শাসকের কবল থেকে মুক্ত হয়ে বাংলার মাটিতে পদার্পন করেন। ১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী পাবনা সিরাজগঞ্জের মানুষদের বন্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য নগরবাড়ীতে ‘মুজিব বাঁধ’ উদ্বোধন করতে আসেন। পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক মন্টু এবং আমি সাংগঠনিক সম্পাদক ও ছাত্রলীগ সহ আওয়ামীলীগের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সাহাবুদ্দিন চুপ্পু মানপত্র পাঠ করেন। মুজিব বাঁধ উদ্বোধন শেষে পাবনার বনমালী ইন্সটিটিউটে এক নাগরিক সম্বোর্ধনায় যোগ দেন। এই অনুষ্ঠানে আমি সহ পাবনার অন্যান্য ছাত্র নেত্রীবৃন্দ উপস্থিত থেকে তাঁকে ফুলের শুভেচ্ছা জানানো হয়।

১৯৭২ সালে ঢাকা রমনা পার্কে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন শেষে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা নর্বনির্বাচিত কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মিন্টু রোডে বর্তমান রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে জাতির পিতার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করতে যাই। যাবার পর বঙ্গবন্ধুর নিকট আমরা আবেদন জানাই যে, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যে সকল কর্মকর্তাগণ মহান মুুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে তাদেরকে প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেবার জন্য। তখন বঙ্গবন্ধু পিতৃতম নিবিড় ও নিখাদ ভালোবাসায় প্রত্যুত্তরে জানালেন যে, “তোমরা মুক্তিযুদ্ধসহ সকল আন্দোলনে দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করছো। তোমাদের মতো দেশপ্রেমিক সন্তানই এই দেশে দরকার। তোমাদের এখন দায়িত্ব স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষায় আত্মনিয়োগ ও দেশের কল্যাণে কাজ করা।

১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তখন আমি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালন করছিলাম। পাবনায় বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে প্রিয়জন বলে খ্যাত আবদুর রব বগা মিয়া নির্বাচনী প্রচারণা করতে গিয়ে বর্তমানে বিআরটিসি গ্যারেজের সামনে সড়ক দূর্ঘটনায় মারাত্মক ভাবে আহত হন এবং পাবনা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা সদর আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। এ সময়ে বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে নাটোর উত্তরা গণভবনে মন্ত্রী পরিষদের সভা চলছিলো। আবদুর রব বগা মিয়ার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে নাটোর উত্তরা গণভবনে মন্ত্রী পরিষদের সভা স্থগিত করে তিনি পাবনা চলে আসেন। বঙ্গবন্ধু আবদুর রব বগা মিয়ার মরদেহ দেখে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে ছিলেন। এ যেন স্বজন হারানোর কান্না। এসময় বঙ্গবন্ধুর পাশে আমি সহ তৎকালীন পাবনা জেলা আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দগণ ছিলেন।

১৯৭৪ সালের ৪ঠা এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নির্মম ছাত্র হত্যাকান্ড ঘটে। যেটা ‘সেভেন মার্ডার’ নামে পরিচিত। এই জঘন্য হত্যাকান্ডে নিহত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা নামমুল হক কোহিনুর সহ আরও ৬ জন। তদন্ত সাপেক্ষে এই হত্যা মামলার প্রধান আসামী হিসেবে সনাক্ত হয় তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান। তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শহীদ মনসুর আলী এবং প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশক্রমে শফিউল আলম প্রধান সহ অন্যান্য সকল আসামীদের গ্রেফতারের নির্দেশ প্রদান করেন । এই নির্দেশের পর পরই সফিউল আলম প্রধান সহ সকল আসামীদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সে সময়ের সভাপতি মনিরুল হক চৌধুরী প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানান। এই প্রতিবাদে সমগ্র বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলা থেকে প্রতিবাদ হলেও পাবনা জেলা ছাত্রলীগ এতে সাড়া দেয়নি। পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা আ স ম আব্দুর রহিম পাকন প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তের সাথে একাত্ততা প্রকাশ করি। এই সমর্থন জানানোর কারনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সংসদ আমাদের কমিটি বাতিল করে দেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই গ্রেফতারের প্রতি সমর্থন না জানানোর কারণে তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজশাহী মহানগর শাখার সভাপতি সমর্থন না জানানোর কারণে তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজশাহী মহানগর শাখার সভাপতি বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কার্যকরী পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম ঠান্টুকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এবং আমি সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম মোহাম্মদ নাসিমের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শহীদ এম মনসুর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করার সুযোগ করে দেন। আমি এবং চুপ্পু সহ জেলা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ মিন্টু রোডে অবস্থিত তৎকালীন গণভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করি এবং তাঁকে বিস্তারিত অবগত করার পর তিনি আমাদেরকে বলেন “দেশের মধ্যে বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্র চলছে তোমাদেরকে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে”। তিনি জানতে চান পাবনা জেলা ছাত্রলীগ বর্তমানে কাদের নিয়ন্ত্রণে”। আমরা বলি সেটা এখনও আমাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। তখন বঙ্গবন্ধু বলেন “ তোমরা ন্যায়ের পথে আছো তোমরাও এগিয়ে যাও”। এরপর আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাবনায় ফিরে আসি এবং আরও উদ্বুদ্ধ হয়ে সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে স্বাভাবিক ভাবে কর্মকান্ড করতে থাকি।
১৯৭৪ সালে সারাদেশ বন্যায় প্লাবিত হলে পাবনা জেলা আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আমরা ত্রাণ সংগ্রহ কার্যক্রম অংশ নেই। পাবনা থেকে সংগৃহীত ত্রাণের অর্থ নিয়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর ত্রাণ তহবিলে জমা দেবার জন্য ঢাকা যাই। গণভবনে ত্রাণের চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠিত হয়। আমরা জাতির পিতার ঘনিষ্ঠ, পাবনার কৃতি সন্তান শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী নেত্রীত্বে গণভবনে বঙ্গবন্ধুর হাতে চেক হস্তান্তর করি। এই চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পাবনা জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি মতরহুম আবু তালেব খন্দকার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মরহুম মোহাম্মদ নাসিম, সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, আমি ও জেলা আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। এটাই ছিল আমার বঙ্গবন্ধুর সাথে শেষ সাক্ষাত।

পাবনায় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি অনন্য। এই স্মৃতির মালায় ভীড় করে আছে টুকরো টুকরো অনেক গল্প। যা আজ ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু পাবনা সফরে আসলে অনেক সময় তৎকালীন পাবনা জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মরহুম আমজাদ হোসেন’ এর বাড়িতে রাত্রি যাপন করতেন এবং যাদের বাড়িতে তিনি আহার করতেন তারা হলেন সাধারণ সম্পাদক আবদুর রব বগা মিয়া ও পাবনার বিশিষ্ট বিড়ি ব্যবসায়ী মরহুম হোসেন খাঁ (হোসেন বিড়িওয়ালা)। পাবনার লক্ষী মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টি ছিল বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয়। লক্ষী মিষ্টান্ন ভান্ডারের কর্ণধার ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একজন ভক্ত। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ১৯৯৪ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর কন্যা তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পাবনার ঈশ্বরদীতে ট্রেনে হামলা করা হয়। আওয়ামীলীগের নেত্রীবৃন্দ মানব প্রাচীর করে তাকে রক্ষা করেন এবং লক্ষ¥ী মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিকানাধীন বাদল পরিবহনে করে নাটোরে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর সহযোগিতা করেন।
আমাদের রাজনীতি উৎসর্গ হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মানবপ্রেম ও দেশপ্রেম দেখে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সেই বজ্রকণ্ঠ ধারণ করেই আমরা যুদ্ধে যাই। ফিরে এসে দেশগঠনের কাজ শুরু করি। এ কারণে আজও শয়নে জাগরণে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিতে অনুপ্রাণিত হই অসংখ্যবার।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা আ.স.ম. আব্দুর রহিম পাকন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *