ফিচার রাজশাহী সারাদেশে

পাবনায় কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মোমিনুর রহমান বরুন

। আমিরুল ইসলাম রাঙা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোমিনুর রহমান বরুন পাবনা শহরের রাধানগর ( নারায়নপুর) মহল্লার বাসিন্দা। ডাকবাংলা সংলগ্ন পৈতৃিক বাড়ী। বাবা মরহুম ডাঃ আবদুর রহমান। বড় ভাই আতিয়ার রহমান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। মেজভাই শহীদ খলিলুর রহমান কিরন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালোরাতে পিলখানায় পাকবাহিনীর হাতে নিহত হন। উনি তখন ইষ্ট বেঙ্গল রাইফেল এ কর্মরত ছিলেন। আরেক ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান তরুন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান তরুন প্রায় চার দশক ধরে অষ্ট্রেলিয়া থাকেন। ছোটভাই হাফিজুর রহমান বুলগানী যাকে মুক্তিযুদ্ধের সময় নক্সালরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। শহীদ বুলগানী ছিল ভারতীয় প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে তার গোটা পরিবারের গৌরব উজ্জল ভূমিকা ছিল। স্বাধীনতার পুর্ব থেকে তাদের পরিবারের একটা আলাদা পরিচিতি ছিল। বাবা খুব জননন্দিত চিকিৎসক ছিলেন । অসহায় গরীব রোগীরা উনাকে খুব ভালবাসতেন। ভাইবোনেরা শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। এক কথায় সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান মোমিনুর রহমান বরুন।

মোমিনুর রহমান বরুন অসীম সাহসী এক মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের শুরুতে পাবনায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। ২৯ মার্চ বালিয়াহালট গোরস্থানে পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন। এরপর পাকিস্তানী সেনারা এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে পুনরায় পাবনা শহরের দখল নিলে বরুন দেশত্যাগ করে ভারত গমন করেন। যুদ্ধের শুরুতেই ভারতের বিহার প্রদেশের চাকুলিয়ায় প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। সীমান্তে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেন। এরপর গ্রুপ লিডার মকবুল হোসেন সন্টুর নেতৃত্বে পাবনা অঞ্চলে প্রবেশ করেন। পাবনার সুজানগর থানা আক্রমন সহ ছোট বড় অনেক যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে তার বলিষ্ট ভুমিকা চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

আজন্ম যোদ্ধা মোমিনুর রহমান বরুন স্বাধীনতা প্রাপ্তির এত বছর পরেও দেশ এবং মানুষের জন্য সংগ্রাম এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীনতার পর একশ্রেনীর লুটেরা যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে লুটপাট, হত্যা নির্যাতন সহ অন্যায় অত্যাচার শুরু করলো, তখন নিরস্ত্র মোমিনুর রহমান বরুন আবার ক্ষুব্ধ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্বাধীনতার পর পরেই রক্ষীবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেন। ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হলেন, জেলখানায় নিক্ষিপ্ত হলেন। দীর্ঘদিন কারা নির্যাতন ভোগ করলেন। বড্ড নির্মম ইতিহাস। যাদের কারনে বরুনের মত মুক্তিযোদ্ধারা রক্ষীবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়েছে, জেল খেটেছে, শত নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা ১৯৭৫ এর পর রুপ বদল করেছেন। রুপ বদল করেননি মোমিনুর রহমান বরুন। দেশ এবং দেশের মানুষের জন্য এখনো সে কাজ করে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন কারাগারে কাটিয়ে বের হলেন। আটঘরিয়ার বেরুয়ানে বিয়ে করলেন। জীবন সংগ্রামের এক পর্যায়ে বি,আর,ডি,বি অফিসে চাকুরী নিলেন। সংসার জীবনে এক ছেলে দুই মেয়ের জনক। বর্তমানে অবসরকালীন জীবন কাটাচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাথে জড়িত। পাবনা জেলা সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

সদা হাসিখুশিতে থাকা বরুন বহু গুনের মানুষ। নানা কারনে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। সৌখিন সঙ্গীত শিল্পী। ভাল গান গাইতে পারেন। এক সময়ে শহরময় প্যারোডী গানের জন্য জনপ্রিয় ছিল। তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে একটি পুরানা ঘটনার কথা মনে পড়লো। ৭৬/৭৭ সালের ঘটনা। আমাদের এক প্রিয় বন্ধু শওকত বিশ্বাস খুলনা থেকে খালেদ হাসান মিলুর নেতৃত্বে একটি ব্যান্ড দল পাবনায় এনেছিলেন।

বনমালীতে অনুষ্ঠান আর আমরা হলাম আয়োজক। প্রচুর দর্শক শ্রোতার সমাগম। মিলু ও তার দলবলের গান চলছে। অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি একটা সময়ে ঘোষনা হলো এবার গান গাইবে পাবনার মোমিনুর রহমান বরুন। দর্শক শ্রোতা প্রথমতঃ অবাক তারপর হতবাক। বরুন মঞ্চে উঠে ঘোষনা করলেন, তার লেখা একটি প্যারোডি গান গাইবেন। গানের রচনা কিভাবে করেছেন তার বর্ননা করে গেয়ে উঠলেন। ” ও এবাদত রে – চা খাবো রে, চা এহন হবিনা – বাকী আমি দেবো না। “। বরুনের গান শুরু হলে শ্রোতারা উল্লাসে ফেটে পড়লো। কিসের মিলু? বরুন বরুন – ওয়ান মোর – ওয়ান মোর। এরপর বরুনের আরেকটা গান – গফুর দাদার পুহিরির পানি ঘোলা দেহা যায়, সেই পুহিরির পানিত মানুষ – সকাল বিকাল লায়। আরেকটি গান ছিল – কলেজ গেটের গফুর মেকারকে নিয়ে। ” ধীরে ধীরে চল গফুর – বাড়ী নয় বহুদূর, ঐতো দেহা যায়। ” আরেকটি গান ছিল ” হরে হরে হরে – আর কতকাল ধরে, খাবি আর তুই গাঁজা, ছেড়া পাঞ্জাবী গায় দিয়ে হরে, কবে হবি তুই রাজা। ইত্যাদি একটার পর একটা গানে বরুন দর্শক শ্রোতাদের মাতোয়ারা করে রেখেছিল। পরিশেষে উক্ত অনুষ্ঠানটি মিলু শো এর পরিবর্তে বরুন শো’তে পরিনত হয়েছিল।

সেই থেকে বরুনকে অনেক অনুষ্ঠানে গান গাইতে হয়েছে। এ ছাড়া কৌতুক, রসগল্পেও খুব জনপ্রিয়। গল্প, কবিতা সহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোমিনুর রহমান বরুন অত্যন্ত বন্ধু পাগল মানুষ। ছোট বড় সবার কাছে প্রিয়। সবাই তাকে পছন্দ করে। পরিশেষে প্রিয় বরুনের সুস্থতা, রোগমুক্তি এবং দীর্ঘায়ু কামনা করি। সে যেন ভাল থাকে এবং দীর্ঘদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকে।

লেখকঃ আমিরুল ইসলাম রাঙা, পাবনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *